Contact: 8951233, +880 1911 485949
Golden Bangladesh, House#6, Road-1, Sector-4, Uttara, Dhaka-1230
সালমা সোবহান

Pictureসালমা সোবহান
Nameসালমা সোবহান
DistrictNot set
ThanaNot set
Address
Phone
Mobile
Email
Website
Eminent Typeপ্রথম নারী ব্যারিস্টার
Life Style

সালমা সোবহান

লমা সোবহান, পুরো নাম সালমা রাশেদা আক্তার বানু। বাংলাদেশের প্রথম নারী ব্যারিস্টার বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী সালমা সোবহান একাধারে শিক্ষক, আইনবিদ, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী, সমাজকর্মী, সর্বোপরি একজন মানবহিতৈষী ব্যক্তি ছিলেন। একজন বৈচিত্র্যময় মানুষ হিসেবে কর্ম, জ্ঞান ও সংবেদনশীলতায় তিনি ছিলেন অতুলনীয়। এত গুণের অধিকারী হয়েও সালমা সোবহান ছিলেন নিভৃতচারী। নিজেকে নিয়ে কোনো ধরনের প্রচার তিনি পছন্দ করতেন না। নীরবে কাজ করে যাওয়া ছিল তাঁর স্বভাব।

অত্যন্ত রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারে বড় হয়েও সালমা সোবহান ছিলেন একজন প্রগতিশীল ও আধুনিকমনস্ক মানুষ। কোনো রকম সংস্কার তাঁর মধ্যে ছিল না। সালমা সোবহান ছিলেন একাধারে একজন কৃতি সংগঠক এবং উন্নত জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ। কর্মী সালমা সোবহান এবং মানুষ সালমা সোবহান উভয় ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন অনন্য অনুসরণীয় এবং অনুকরণীয়। সালমা সোবহানের আরেকটি অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি কখনও Value Judgment করতেন না। তিনি কখনও বলতেন না, এটি করা উচিত হয়নি, এটি করা উচিত বা এটি করতে হবে। তিনি বলতেন, এটি করলে কেমন হয়? সকল বিষয়ে অন্যের মতামত নেয়া ছিল তাঁর স্বভাবজাত। অত্যন্ত ধার্মিক সালমা সোবহানের মধ্যে কোনো রকম ধর্মীয় গোঁড়ামি ছিল না।

বংশপরিচয়, জন্ম ও মৃত্যু

উপমহাদেশের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে ১৯৩৭ সালের ১১ আগস্ট সালমা সোবহান জন্মগ্রহণ করেন। তাঁরা ছিলেন তিন বোন এবং এক ভাই। তাঁর বাবা মো. ইকরামুল্লাহ ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম পররাষ্ট্র সচিব। পরবর্তীতে তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে ফ্রান্স এবং যুক্তরাজ্যে দায়িত্ব পালন করেছেন। মা শায়েস্তা ইকরামুল্লাহ ছিলেন পাকিস্তানের প্রথম মহিলা সংসদ সদস্যদের অন্যতম। এছাড়া শায়েস্তা ইকরামুল্লাহ মরোক্কোয় পাকিস্তান সরকারের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। অর্থাত্‍ মা-বাবা দু'জনই রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শুধু তাই নয়, সালমা সোবহানের শ্বশুরও পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এরকম নজির ইতিহাসে বিরল। সালমা সোবহানের স্বামী বাংলাদেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ এবং সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক রেহমান সোবহান। সালমা সোবহানের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল অতুলনীয়। উপমহাদেশের অবিসংবাদিত নেতা ও তত্‍কালীন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন তাঁর মামা। চাচা বিচারপতি হেদায়েত উল্লাহ ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী ভারতের উপ-রাষ্ট্রপতি। সালমা সোবহানের পূর্ব পুরুষরা প্রথমে ভারতের উত্তর প্রদেশ এবং পরে মধ্য প্রদেশের অধিবাসী ছিলেন।

২০০৩ সালের ২৯ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ৬৬ বছর বয়সে সালমা সোবহান তাঁর গুলশানের বাসভবনে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর এই মৃত্যুতে বাংলাদেশের যে ক্ষতি হলো তা এক কথায় অপূরণীয়।

শৈশবকাল

সালমা সোবহানের শৈশব কেটেছে রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের আবহে। রক্ষণশীল পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশে বড় হলেও সালমা সোবহান উদার এবং সংস্কারমুক্ত আধুনিকমনস্ক মানুষ হিসেবেই বেড়ে উঠেছিলেন। দু'বছর বয়স পযর্ন্ত সালমা সোবহান কোনো কথা বলতে শেখেননি। শিশু সালমার প্রথম কথা ছিল," I want my barley water (আমি বার্লি জল চাই)"৷

ছোটবেলা থেকেই সালমা সোবহান খুব বুদ্ধিমতি ছিলেন। কিন্তু অত্যন্ত অল্প বয়সে তাঁর চোখের ক্ষীণদৃষ্টি ধরা পড়ে। ফলে বই পড়ার ব্যাপারে তাঁর ওপর কিছুটা নিষেধাজ্ঞা আরোপিত ছিল। শৈশবে তাঁকে স্কুলে পাঠানো হয়েছিল শুধু সামাজিকতার কারণে, সত্যিকার অর্থে পড়াশুনার জন্যে নয়। ছোটবেলায় খাওয়া-দাওয়ার ব্যাপারে সালমার অনীহা ছিল প্রবল। শুধু ডিম ছাড়া কিছুই খেতে চাইতেন না, দুধ খেতে মোটেও পছন্দ করতেন না। একবার মা তাঁকে বোঝানোর জন্যে তাঁর বান্ধবী গীতার উদাহরণ দিয়ে বলেছিলেন, 'দেখো গীতা কত লম্বা, কারণ সে নিয়মিত দুধ খায়।' উত্তরে ছোট সালমা বলেছিলেন, 'গীতা লম্বা কারণ, তার মা লম্বা। আমি কখনও লম্বা হব না কারণ, তুমি তা নও।'

মাত্র চার বছর বয়সে সালমা নিজে নিজে পড়তে ও বুঝতে শেখেন। প্রথম যে বইটি তিনি পড়তে এবং বুঝতে পারেন, সেটি ছিল 'Gutta Perchas Adventures Under The Sea'. তিনি প্রথম পড়তে পারার আনন্দে এতই উদ্বেলিত ও উত্তেজিত হয়েছিলেন যে, দৌড়ে বাবা-মা'র কাছে ছুটে যান এবং বলতে থাকেন- 'আমি পড়তে পারি।' এ ঘটনায় তাঁর বাবা-মা খুশী হওয়ার চেয়ে বেশি চিন্তিত হয়ে পড়েন, সালমার চোখ নিয়ে। কারণ, দৃষ্টিশক্তির সমস্যার কারণে সালমার বেশি পড়াশুনা করা নিষেধ ছিল। সালমার পুরো শৈশব কালটাই খুব বেশি পড়াশুনা করার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা ছিল। তবে পড়ার ব্যাপারে সালমার ঝোঁক ছিল প্রচণ্ড। হাতের কাছে যা পেতেন, তা-ই লুকিয়ে লুকিয়ে ক্ষুধার্তের মতো পড়তেন। তার ধরা পড়ার কাহিনীও ছিল অসংখ্য। সালমা সোবহান ছিলেন অত্যন্ত কল্পনাপ্রবণ। ছোটবেলায় তিনি মজার মজার খেলা আবিষ্কার করতেন এবং বোনদের নিয়ে খেলতেন। ছোটবেলা থেকেই সালমা সোবহানের গল্প লেখার ঝোঁক ছিল। মাত্র আট বছর বয়সে তাঁর লেখা প্রথম গল্প ছাপা হয় কলকাতার শিশু ম্যাগাজিন 'সাপ্তাহিক শংকর'-এ। কৈশরে তিনি উর্দু ম্যাগাজিন 'বানাট' (Banaat)-এ লিখতেন। সালমা সোবহান উর্দু কবিতা পছন্দ করতেন এবং প্রচুর উর্দু শায়েরি (Verses) তাঁর মুখস্থ ছিল। রোমাঞ্চকর কাহিনী (Thriller) এবং শিশুদের কল্পকাহিনীর (Childrens Fiction) ভক্ত ছিলেন তিনি।

শিক্ষা জীবন

সালমা সোবহানের শিক্ষা জীবন শুরু হয় ইংল্যান্ডের ওয়েস্টনবার্ট স্কুলে। পরবর্তীকালে ১৯৫৮ সালে কেমব্রিজের গির্টন কলেজ থেকে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫৯ সালে লিংকন'স ইন থেকে বার এট' ল সনদপ্রাপ্ত হন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন ১৯৬২ সালে। ১৯৫৮ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে তিনি ব্যারিস্টার ডিগ্রি লাভ করেন।

কর্মজীবন

সালমা সোবহানের কর্মজীবন ছিল বর্ণাঢ্য। কর্মজীবনের শুরুতেই ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তানের মেসার্স সারিজ অ্যান্ড বিচেনো ল' ফার্মে লিগ্যাল এসিস্ট্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে কর্মরত ছিলেন ১৯৬১ সাল পর্যন্ত। ১৯৬২ সালে প্রফেসর রেহমান সোবহানের সাথে বিয়ে হওয়ার পর তিনি ঢাকা চলে আসেন।

সালমা সোবহান ১৯৬২ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ১৯ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে শিক্ষকতা করেন। আইন বিভাগের একেবারে শুরুতে যেসব আইনবিদ শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, সালমা সোবহান তাদের অন্যতম। ১৯৭৪ সাল থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ল' অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্স (বিলিয়া)-র গবেষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন৷

বিলিয়া দেশের বিভিন্ন জেলার জজদের জন্যে আইন বিষয়ে যে প্রশিক্ষণ (Judicial Training) আয়োজন

করে, তাতে সালমা সোবহান ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ণ Resource Person। সালমা সোবহানের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা এবং ধারণা নিয়েই প্রথম এধরনের প্রশিক্ষণের পাঠক্রম তৈরি করা হয়।

সালমা সোবহান বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সাথে সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন এবং মহিলা পরিষদের প্রথম যে নারী নির্যাতন তিরোধ কমিটি হয় সেই কমিটির অত্যন্ত সক্রিয় একজন সদস্য হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি 'ইউনিফর্ম ফ্যামিলি কোড' তৈরির কাজে বিশেষভাবে সহযোগিতা করেছেন। সালমা সোবহান বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের জাতীয় পরিষদের সদস্য ছিলেন এবং আমৃত্যু উপদেষ্টামণ্ডলীর একজন সম্মানিত সদস্য ছিলেন। ১৯৮১ থেকে ১৯৮৮ পর্যন্ত তিনি কোর্ট ল' রিপোর্টসের সম্পাদক ছিলেন। সালমা সোবহান ১৯৮৫ সালে বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকে যোগদান করেন। তিনি ব্র্যাকের পরিচালনা পরিষদ সদস্য হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন।

১৯৮৬ সালে তিনি এবং আরও আটজন মানবাধিকার কর্মী মিলে 'আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)' নামে মানবাধিকার সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠাকাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছর সংগঠনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে তিনি বিনা পারিশ্রমিকে কাজ করেন। তাঁর কর্মকালে মানবাধিকার এবং বঞ্চিত নারীদের আইনি সহায়তার ক্ষেত্রে আসক বাংলাদেশের একটি প্রধান সংগঠন হিসেবে স্বীকৃতি পায়। বর্তমানে আসক এর কর্মী সংখ্যা দু'শ এবং এটি এখন আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত একটি সংস্থা।

আইন সহায়তা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) প্রতিষ্ঠায়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। এছাড়া অসংখ্য মানবাধিকার ও পেশাজীবী সংগঠনের সাথে তিনি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

তথ্যসূত্র : গোল্ডেন বাংলাদেশ


 
UploaderMd. Mijanur Rahman Niloy
No results found.
No results found.

© 2017 Golden Femina. Developed by Optimo Solution