Contact: 8951233, +880 1911 485949
Golden Bangladesh, House#6, Road-1, Sector-4, Uttara, Dhaka-1230

সংগ্রামী নারীরা তোমাদের সালাম

সংগ্রামী নারীরা তোমাদের সালাম

নারীমুক্তি আন্দোলন নারী জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তির এবং সমান অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে সংগ্রামের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী ঘটনা। ৮ মার্চ নারী আন্দোলনের ঐতিহাসিক দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য জাতিসংঘের ভূমিকা অপরিসীম। ৮ মার্চ নারী দিবসকে স্মরণ করে ১৯৭৫ সালকে জাতিসংঘ নারীবর্ষ হিসেবে ঘোষণা দেয়। পর্যায়ক্রমে ১৯৭৬-১৯৮৫ দশককে জাতিসংঘ কর্তৃক 'নারী দশক' হিসেবে ঘোষণা দিয়ে নারী প্রগতির উদ্দেশে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশ তৃতীয় বিশ্বের অন্যতম দারিদ্র্য ও শিল্পে অনুন্নত দেশ হলেও নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় এ দেশটি হয়েছে বিশ্বনন্দিত। এ অধিকার রক্ষায় যেসব নারীরা বিরাট ভূমিকা রেখে এসেছে তাদের জানাই সালাম। নিজেদের অধিকার ও আত্মরক্ষার পাশাপাশি দেশের জন্যও তারা ছিল নিবেদিত প্রাণ। কখনো তারা ছিল সামনে কখনো পিছনে। তারপরও কাজ করেছে একাগ্রচিত্তে। জয়ের মালা আসুক আর নাই আসুক এখনো তারা উজ্জ্বল হয়ে আছে আমাদের মধ্যে।
হেনা দাস : হেনা দাস ১৯২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি সিলেট শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা ছিলেন রায় বাহাদুর সতীশ চন্দ্র দত্ত ও মা মনোরমা দত্ত। হেনা দাস শিক্ষক ও নারী নেত্রী ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, চা শ্রমিকদের আন্দোলন, কমিউনিস্ট আন্দোলন, শিক্ষক আন্দোলন, সর্বোপরি নারীমুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই তিনি অবিভক্ত ভারতে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। সেই শুরু। এরপর প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন যে কোনো অন্যায়-অবিচারে। লিঙ্গবৈষম্যের ব্যাপারে ছিলেন কঠোর প্রতিবাদ। সমাজতান্ত্রিক রাজনীতিতেও ছিলেন সক্রিয়। কৃষক, শিক্ষক ও মজুরদের অধিকার আদায়ে ছিলেন সোচ্চার। তার সময় নারীদের ঘরের বাইরে বের হওয়া ছিল অসম্ভব। সেই সময় নারীদের ক্ষমতায়ন এবং অধিকার আদায়ে হেনা দাস ছিলেন অগ্রজ। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থেকে ধৈর্য ও পরমত সহিষ্ণুতার সঙ্গে সংগ্রাম করে গেছেন। নারায়ণগঞ্জ মহিলা পরিষদ ও কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভানেত্রী ছিলেন তিনি। বেগম সুফিয়া কামালের মৃত্যুর পর হেনা দাস মহিলা পরিষদের সভানেত্রী নির্বাচিত হন। নানা প্রতিকূল অবস্থার কারণে পুরো ৭ বছর তিনি দক্ষতার সঙ্গে মহিলা পরিষদকে পরিচালনা করেছেন। ২০ জুলাই ২০০৯ সালে হেনা দাস মৃত্যুবরণ করেন।

এবাদন বিবি : এক সময় ছিলেন দিনমজুর। এরপর তিনি এখন তার মতো আরো অনেক ভূমিহীন নারীরা অধিকার আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখে চলেছেন। দারিদ্র্য অসহায়ও তাকে আগলে ধরলেও সাহস এবং সৃজনশীলতা এ দুটোই ছিল এবাদনের সহজাত। নারীমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম নারী বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের জন্মদিন ৯ ডিসেম্বর। সর্বপ্রথম এবাদন বিবির হাত ধরে বেগম রোকেয়ার জন্মদিন পালন করা শুরু হয়। এবাদন বিবির আন্দোলনের কারণে জীবন পাল্টে যায় গ্রামের ভূমিহীন নারীদের জীবনযাত্রা। নিজের এলাকা ছেড়ে এ আন্দোলন ছড়িয়ে দেন বিভিন্ন অঞ্চলে। এবাদন বিবির সংগ্রাম আমাদের নারী জাতিকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্ন দেখাবে এবং সংগ্রামে করে তুলতে সহায়ক হবে।
সন্ধ্যা রায় নামটি এক অসাধারণ মনোবলও সংগ্রামী নাম। ১৯৭১ সাল দেশ স্বাধীনতার যুদ্ধ চলছে। সেই যুদ্ধে বাংলার অনেক সংগ্রামী নারীরা ঝাঁপিয়ে পড়ে তাদের একজন সন্ধ্যা রায় স্বাধীনতার জন্য লড়ছেন বাঙালি। যুদ্ধাহত সৈনিকদের সাহায্য করার জন্য মাত্র ১৭ বছর বয়সী সন্ধ্যা রায় ঘর ছাড়েন। কাজের প্রতি ভালোবাসার টানে দেশ স্বাধীন হওয়ার পরও ঘরে ফেরা হয়নি সন্ধ্যা রায়ের। সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন করতে যোগ দিলেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রে।৩০ বছর তিনি গণস্বাস্থ্যে কাজ করেন। এই দেশের আপামর সাধারণ জনগণের জন্য উন্নত স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ তৈরির স্বপ্ন পূরণের পথেই হাঁটছেন ৫৪ বছরের সন্ধ্যা রায়। ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল মনোনয়ন পাওয়া এক হাজার নারীর মধ্যে সন্ধ্যা রায় একজন।
সুফিয়া খাতুন একজন অজপাড়াগাঁয়ের নারী। সংসার জীবনে যার কোনো মূল্যায়ন ছিল না। নিজের মত প্রকাশেরও ছিল না স্বাধীনতা। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন ঘরের চার দেয়ালে বন্দি। সংসারজীবনে নানা নির্যাতন মুখ বুঝে সইতে হয়েছে সুফিয়া খাতুনকে। 'নিজেরা করি' নামের সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগ হয় তবে। এই এনজিওর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পর তার জীবন পাল্টে যেতে থাকে। তিনি জানতে পারেন মানবাধিকার সম্পর্কে। আস্তে আস্তে এনজিওর সহযোগিতায় শিখে নেন মানবাধিকার রক্ষার যৌথ উদ্যোগগুলো। এরপর সেই শিক্ষা ছড়িয়ে দেন নিজের এলাকার অসহায় নারীদের মাধ্যমে নারীদের সচেতন ও উদ্যোগী করে তোলেন। গ্রামের নারীদের সঙ্গে করে বেরিয়ে পড়েন পাশের গ্রামেও। এভাবে নিজের বন্দি জীবন থেকে তিনি মুক্ত হন এবং অন্য নারীদের সহায়তা করেন। তার এলাকায় গৃহনির্যাতন পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়ার কৃতিত্ব হিসাবে ২০০৫ সালে শান্তিতে নোবেল মনোনয়ন পাওয়া ১০০০ নারীর মধ্যে নিজের নামটিরও স্থান করে নেন।
একের ভিতরে যার অনেক কিছুর অবদান, তিনি হলেন নন্দা রানী দাস, নারীর অধিকার রক্ষা, ভূমিহীনদের অধিকার আদায়ের যুদ্ধ, যিনি দুহাতেই সামাল দিয়েছিলেন সেই নন্দা রানী দাসের জন্ম ১৯৬০ সালে। ২৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি এ আন্দোলন সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত। উপেক্ষা করে চলেছেন জাগতিক সমৃদ্ধি। অসহায় ভূমিহীনদের এক সঙ্গে করে সংগঠন তৈরি করেন এরপর অধিকার আদায়ে নেমে পড়েন। দুর্নীতির বিরুদ্ধেও তার রয়েছে অনেক সংগ্রাম। গ্রামে মফস্বলে ও স্থানীয় পর্যায়ে সংখ্যালঘুরা যেসব সমস্যায় পড়ে তার মধ্যে একটি হলো ভূমি বা সম্পত্তি হাতছাড়া। সংখ্যালঘু নারীদের ভূমির অধিকার আদায়ের বিষয়টিকে নন্দা রানী দাস প্রথমে সবার সামনে তুলে ধরেন।
১৯৪৮ সালে জন্ম হয় খুশি কবিরের। বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও শান্তির জন্য অনেকে নিরলস সংগ্রাম করে তাদের মধ্যে অন্যতম মশালবাহী নারীর ক্ষমতায়ন শান্তি ও গণতন্ত্রের ছিলেন তিনি। ৩০ বছরেরও বেশি সময় ধরে কাজ করেছেন গ্রামের শ্রমজীবীদের অধিকার আদায়ে।

লেখক :
রহিমা আক্তারসূত্র : যায়যায়দিন

© 2017 Golden Femina. Developed by Optimo Solution