Contact: 8951233, +880 1911 485949
Golden Bangladesh, House#6, Road-1, Sector-4, Uttara, Dhaka-1230

নারীর অবদান দৃশ্যমান হোক

নারীর অবদান দৃশ্যমান হোক

'আপনার স্ত্রী কী করেন' জানতে চাইলে শতকরা ১০০ জন গৃহবধূর স্বামী শ্রেণী নির্বিশেষে উত্তর দেবেন, 'কিছু করে না'। শিক্ষিত পুরুষ বড়জোর বলবেন_ 'কিছু করে না; গৃহবধূ'। আর শ্রমজীবী শ্রেণীর কেউ হলে বলবেন_ 'কিছু করে না; ঘরের কাম-কাইজ করে।' এই 'কিছু না করা'র মধ্যে রান্না, সন্তান জন্মদান, লালন-পালন, পড়ানো, কাপড় কাচা, বাজার করা থেকে শুরু করে ঘরের সচ্ছলতা বাড়াতে হাঁস-মুরগি ও গরু-ছাগল পালন, বাসাবাড়িতে কাজ করা, বিড়ি বানিয়ে বা কাঁথা সেলাই করে বিক্রি, এমনকি কৃষিকাজের অদৃশ্য একটি বড় অংশ পর্যন্ত পড়ে।
আর ঘরের বাইরের অর্থনৈতিক কাজে যে বিপুল সংখ্যক নারী অংশ নিচ্ছেন, তাদের সঠিক পরিসংখ্যান নেই বা পরিসংখ্যানে খানিকটা থাকলেও সেই অবদানের দৃশ্যমানতা নেই জনপরিসরে। ফলে সরাসরি অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজে চাকরি না করা পর্যন্ত 'মা কিছু করে না'_ এমন বোধ নিয়েই শিশুরা বড় হয়। তাদের মস্তিষ্কে নারীর কিছু না করার পরিচয়টি এতটাই স্থায়ী যে, গত ৫০ বছরে দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নারীর যে বিপুল আর অবিরল অংশগ্রহণ, সে ছবিটি আজও স্পষ্ট হয়ে ওঠেনি। প্রতি বছর বাজেট ঘোষণা হয়। কোনো নারীকে বাজেট বিষয়ে কোনো সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছেন_ এমন দেখিনি কখনও। অর্থনীতি আজও পুরুষের শাস্ত্রই থেকে গেল। এমনকি নাচোল বা সুসং দুর্গাপুরের কৃষক আন্দোলন, যা অত্যন্ত প্রগতিশীল আন্দোলন, সেই আন্দোলনের প্রগতিশীল স্লোগান :'লাঙ্গল যার জমি তার'ও দিনশেষে নারীর জন্য কোনো অর্জন আনে না। কারণ আজও উৎপাদনের উপায়গুলোর ওপর নারীর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। হয়নি ভূমির ওপর মালিকানা কিংবা উত্তরাধিকার সম্পত্তিতে। ফলে তেভাগা আন্দোলনের ফল যাই-ই হোক, দিনশেষে সেই ফল নারীর জন্য কিছু বার্তা আনে না সরাসরি।
নারী যদি নির্যাতনের শিকার না হন তবে সংবাদপত্রে বা যে কোনো গণমাধ্যমে নারীকে সংবাদের সূত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয় না। নারীকে কল-কারখানা, হাট-বাজার, উৎপাদনে দেখানো হয় না। অথচ চলচ্চিত্র-নাটক-সংবাদ_ সব জনপরিসরেই নারীর বিপুল উপস্থিতি রয়েছে। কী সেই উপস্থিতি? পুঁজিবাদী বিনোদন ও সৌন্দর্য ইন্ডাস্ট্রির একটি বড় অংশের সাফল্য নির্ভর করে নারীর দেখন-সৌন্দর্যকে ঘিরে। অথচ ইতিমধ্যে নারীরা সরকারপ্রধান, মন্ত্রী, স্থানীয় সরকার, স্কুল-কলেজের শিক্ষক, খেলোয়াড়, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, সেনাবাহিনী, বিজিবি, র‌্যাব-পুলিশ, রাজপথের নেত্রী, উকিল-ব্যারিস্টার, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, শ্রমিক, ব্যাংক কর্মকর্তা_ কী না হয়েছেন! নাটকের অভিনেত্রী নয় শুধু; তারা আজ ক্যামেরার পেছনেও কাজ করছেন; অনুষ্ঠান নির্মাণ ও সম্পাদনা করছেন। আরও করছেন সাংবাদিকতা। তবুও নারীর অবদানের দৃশ্যমানতা নেই কেন? কে দৃশ্যমান করবেন? কীভাবে করবেন?
এই তিন প্রশ্নের উত্তর খোঁজার বিকল্প নেই। দৃশ্যমানতা নেই, কারণ অবদানের স্বীকৃতি নেই। গ্রামীণ নারীদের শতকরা ৬৫ জন কৃষিকাজে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত। তবু তারা কৃষক হিসেবে স্বীকৃত নন। নারী উন্নয়ন নীতিমালা ২০১১-এর একটি অনুচ্ছেদে নারীনেত্রীরা নারী কৃষকদের স্বীকৃতির দাবি করছেন। সরকার নারী কৃষকদের স্বীকৃতি দিয়ে নীতিমালা প্রণয়ন করলে কৃষিক্ষেত্রে উন্নয়নের সুবিধা তারা পাবেন।
নারীদের শ্রমে-ঘামে এদেশের সবচেয়ে বড় বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের খাতটি টিকে আছে_ তৈরি পোশাক। পোশাকশিল্পে নারীর দৃশ্যমানতাই ছিল স্বাভাবিক। কারণ ৯০ শতাংশই নারী শ্রমিক। কিন্তু আমাদের ঘুম ভাঙার অনেক আগেই, ভোরের অন্ধকারে, শহর জেগে ওঠার আগে তারা কারখানায় যান এবং রাত নেমে আসার পর ফেরেন বাড়িতে। আমাদের নাগরিক চোখের আওতায় তারা আসেন না। আর এলেও তাদের অবয়ব দেখে বোঝার উপায় থাকে না, কী বিপুল অবদান তারা রেখে চলেছেন! আমাদের প্রাথমিক শিক্ষা খাতে নারী শিক্ষকরা রয়েছেন ৭০ শতাংশের ওপরে। কিন্তু কয়টি নাটক-চলচ্চিত্র-উপন্যাস, গল্প-খবরে উঠে আসে নারী কৃষক, নারী শ্রমিক, নারী শিক্ষকের অবদান? আসে না। প্রথম সংকটটি তাই স্বীকৃতির সংকট। জেন্ডার-রাজনীতির বৃত্তে আটকে আছে এই সংকট।
এবার আসা যাক, কারা দৃশ্যমান করবেন? দৃশ্যমান করার ক্ষমতা রাখেন যারা, দৃশ্যমান করার ক্ষমতা তাদেরই, যাদের হাতে দৃশ্যমান করার কলাকৌশলের মালিকানা রয়েছে। ঐতিহাসিক নানা কারণে সেসব মালিকানা পুরুষের হাতেই ন্যস্ত। সেসব মালিকের মস্তিষ্কে নারী যে কিছু করেন_ সেই সত্যটিই বাসা বাঁধেনি। দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, শুধু যে পুরুষ এই বিষয়ে নির্বিকার_ এমন নয়। নারী নির্মাতা, নারী সাংবাদিক, নারী নাট্যকার, নারী লেখক, নারী কর্মকর্তারাও উদ্যোগী হন না। কেন হন না? কারণ তারাও বেড়ে উঠেছেন পুরুষতান্ত্রিক 'দেখন-কাঠামো'তে। যে কাঠামো নারীকেও পুরুষের চোখেই পৃথিবী দেখায়। ফলে প্রশ্নটি এখানে পুরুষতান্ত্রিক কাঠামোর।
এই পুরুষতান্ত্রিক মনন-কাঠামোর দুর্গে হানা দেওয়ার কি কোনো উপায় নেই? আছে বৈকি, যদি নারীর অবদানের স্বীকৃতিটি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দেওয়া যায় এবং যেমন সুপারিশ করা হয়েছে সিডও সনদ বা চতুর্থ বেইজিং সম্মেলনে সেই অনুযায়ী যদি নারীর অবদানকে দৃশ্যমান করার ব্যাপারে শিক্ষিত করে তোলা যায় গণমাধ্যমসহ সব প্রচার মাধ্যমকে। নারীর অবদান এবং ব্যক্তিক-সামষ্টিক অর্জনকে গণমাধ্যমে অবিরতভাবে উপস্থাপন করতে হবে। নাটক-চলচ্চিত্র-বিজ্ঞাপন, সংবাদ, গল্প-উপন্যাসে নারীর চিরায়ত জেন্ডার ভূমিকার যে পরিবর্তনটি সমাজে ইতিমধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেইটুকু তুলে ধরা হোক প্রথমে। কোনো পোশাক শ্রমিককে নিয়ে আজও তো কোনো মানউত্তীর্ণ গল্প-উপন্যাস কোথাও লেখা হলো না! তারা পুড়ে বা তালাবদ্ধ গেটে পদপিষ্ট হয়ে মরলেই কেন কেবল পত্রিকায় স্থান পাবে? এক্ষেত্রে জেন্ডার সংবেদনশীল নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার মনিটরিং জরুরি। প্রয়োজন জেন্ডারসংবেদী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন, যেখানে কেবল নারীর প্রতি নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সংবলিত বিষয়বস্তু দূর করাই যথেষ্ট নয় বরং নারীর অবদানকে তুলে ধরতে হবে। শৈশব থেকেই যেন সবাই দেশ-নির্মাণের প্রতিটি পর্যায়ে নারীর অবদানটি অনায়াসভাবে শিখে বড় হতে পারে।
এই মাসটি স্বাধীনতা সংগ্রাম শুরু হওয়ার মাসও বটে। মুক্তিযুদ্ধে প্রবাসী সরকার পোস্টার করেছিল_ 'বাংলার মায়েরা-মেয়েরা সকলেই মুক্তিযোদ্ধা'। ৯ মাসব্যাপী যুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণের স্বীকৃতিস্বরূপ নির্যাতিত এবং নানাভাবে যুদ্ধে অংশ নেওয়া নারীকে বাংলাদেশ গত বছর যে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সেটি যেমন পাঠ্যবইয়ে পড়ানো জরুরি, তেমনি জরুরি মুক্তিযোদ্ধা নারীদের জীবনী ও যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণকে সম্মানের সঙ্গে তুলে ধরা, যা আজও হয়নি। তাহলে শিশুটি তা জেনেই বড় হবে_ এই দেশটি কেবল পুরুষ মুক্তিযোদ্ধার রক্তে নয়; নারীর আত্মত্যাগ আর নির্যাতন ইতিহাসের ওপরও তৈরি। এভাবেই শুরু হোক।
আমার প্রজন্মের নারীদের সংকটে পড়তে না দেওয়ার বা বাড়ির বাইরে অর্থনৈতিক কাজে যেতে না দেওয়ার সংকট যতটা না, তার চেয়ে বেশি নারীরা যেসব কাজ ইতিমধ্যে করেছেন তার দৃশ্যমানতা না থাকার সংকট। যে অবদান ইতিমধ্যে নারী রেখেছেন সেটুকুই সম্মানের সঙ্গে দৃশ্যমান করা হোক। নারী-পুরুষ-পরিবার-সমাজ-আইন-রাষ্ট্র সবাই বুঝতে পারবেন তাহলে বাকিটা অর্জনের জন্য সামনে কী করণীয়।

ড. কাবেরী গায়েন : অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

প্রকাশক : দৈনিক সমকাল

© 2017 Golden Femina. Developed by Optimo Solution