Contact: 8951233, +880 1911 485949
Golden Bangladesh, House#6, Road-1, Sector-4, Uttara, Dhaka-1230

নারীর ক্ষমতায়নে কেন গুরুত্ব বাড়াতে হবে

নারীর ক্ষমতায়নে কেন গুরুত্ব বাড়াতে হবে

প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ করার পর একজন তরুণ নিজ জেলার বাইরে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করে যেভাবে কাক্সিক্ষত চাকরির খোঁজ করে থাকে, বিভিন্ন কারণে একজন শিক্ষিত তরুণী তা পারে না। ফলে শিক্ষিত তরুণীদের অনেকেই দীর্ঘ সময় পর্যন্ত বেকার থাকতে বাধ্য হয় অথবা স্বল্প বেতনের কোনো কর্মে নিযুক্ত হয়। নিজের যোগ্যতা ও দক্ষতা সময়মতো কাজে লাগাতে না পেরে উল্লিখিত শিক্ষিত তরুণীরা বিশেষভাবে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে শিক্ষিত বেকার তরুণ-তরুণীরা বিশেষভাবে উপকৃত হবে। কিন্তু উপজেলা পর্যায়ে শিল্প-কারখানা স্থাপনের ক্ষেত্রে অনেক বাধা রয়েছে। যোগাযোগ খাতের সমস্যাসহ অন্যান্য বাধা দূর না হলে কোনো বিনিয়োগকারীই প্রত্যন্ত অঞ্চলের উপজেলা পর্যায়ে বিনিয়োগে আগ্রহী হবেন না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিদ্যমান সমস্যাগুলো সরকারি উদ্যোগে দূর করার ব্যবস্থা নেয়া হলে উপজেলা শহরের বাইরেও শিল্প-কারখানা স্থাপনে অনেকে আগ্রহী হবেন। বর্তমান বাস্তবতায় সারা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিংবা উপজেলা পর্যায়ে শিল্প-কারখানা স্থাপনের বাধাগুলো অল্প সময়ে দূর করার কাজটি কঠিন। কিন্তু বিদ্যমান কুটিরশিল্পের পরিচর্যায় সরকার বিশেষ উদ্যোগ নিলে একদিকে যেমন নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, তেমনি বিভিন্ন পণ্য রফতানির মাধ্যমে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ সুগম হবে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

সমাজে পিছিয়ে থাকা নারীদের মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার জন্য তাদের সক্ষমতা বাড়ানোর পদক্ষপে নিতে হবে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ানোর জন্য বর্তমানে সরকারি উদ্যোগে নেয়া পদক্ষেপ যেসব দরিদ্র পরিবারের শিশুরা নিতে অক্ষম, সেসব পরিবারের শিশুরা বিশেষত মেয়ে শিশুরা যাতে শিক্ষার সুযোগ যথাযথভাবে গ্রহণ করতে পারে তার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। শিক্ষা শেষে প্রত্যেক তরুণ-তরুণী যাতে তাদের পছন্দের পেশায় যোগদান করতে পারে এ জন্যও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নের অন্যতম অন্তরায় সুস্বাস্থ্যের অভাব। প্রত্যন্ত অঞ্চলের বিপুলসংখ্যক দরিদ্র মানুষের একমাত্র ভরসাস্থল উপজেলার সরকারি হাসপাতাল। উপজেলা পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার মান নিয়ে মিডিয়ায় প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে সেবাপ্রত্যাশীদের হতাশার চিত্রটিই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এসব সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের তৎপরতা আরও বাড়বে- এটাই প্রত্যাশিত।যে কোনো বয়সী তরুণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যেভাবে যুক্ত হতে পারে, একজন তরুণী তা পারে না। এ প্রেক্ষাপটে ঝরে পড়া সব মেয়ে শিশুর বৃত্তিমূলক শিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। ঝরে পড়া সব শিশুকে বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের আওতায় আনার জন্যও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।২.নারী নির্যাতন রোধে করণীয় নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকার বিষয়টি ইতিবাচক। যৌতুকের অভিশাপ নিয়ে যত আলোচনাই অব্যাহত থাকুক না কেন, আমাদের সমাজ এ অভিশাপ থেকে মুক্ত হতে পারছে না। যৌতুকের ব্যাপক বিস্তার থেকেই স্পষ্ট হয় সমাজে দরিদ্র নারীর জীবন কতটা অরক্ষিত। সমাজকে এ ব্যাধি থেকে মুক্ত করার জন্য সবাইকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে। নারীদের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হওয়ার হার বাড়লে এবং তাদের শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত হলে নারী নির্যাতনের হার কমবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।৩.সমাজে প্রান্তিক পর্যায়ের নারীরা কেমন আছেন, এ ধরনের যে কোনো আলোচনায় প্রথমেই নারীর নিরাপত্তাহীনতার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। অবাক হতে হয়, নারীর নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে এত আলোচনার পরও এ বিষয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা যায় না। নারী নির্যাতনবিষয়ক যে কোনো জরিপে যেসব তথ্য বেরিয়ে আসে তা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হয়। সাধারণত উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশের দরিদ্র নারীরা তুলনামূলক বেশি নির্যাতনের শিকার হয়। এ বাস্তবতায় নারীর চলার পথ কতটা কণ্টকমুক্ত করা যায় সেদিকে বিশেষ নজর দেয়া দরকার। নারী নির্যাতন রোধে বহুমুখী পদক্ষেপ নেয়ার পরও এ ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত ফল না পাওয়ার কারণ বিশ্লেষণ করা জরুরি।বিশেষ করে যেসব নারী খণ্ডকালীন বিভিন্ন কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের অনেকেই ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হন। তারা যে বঞ্চিত হচ্ছেন, এ বিষয়টিও তাদের অনেকেই জানেন না। যেসব পরিবারের নারীরা বংশপরম্পরায় শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ নানা কারণে যেসব মানুষ উদ্বাস্তুতে পরিণত হন; তারা সাধারণত নিকটবর্তী শহরে গিয়ে আশ্রয় নেন। এই উদ্বাস্তুদের অনেকেই এক সময় রাজধানীতে এসে ভিড় করে। এই উদ্বাস্তুরা সহিংসতার শিকার হলেও অনেক সময় তা অপ্রকাশিত থেকে যায়। তাদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষার সুযোগ বিস্তৃত করা না হলে ভাসমান জনগোষ্ঠীর নারী ও শিশুদের জীবন অরক্ষিত থেকে যাওয়ার আশংকা বেড়ে যায়।সাধারণভাবে যেসব নারী মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত, তারা তুলনামূলক কম সহিংসতার শিকার হন। এ প্রেক্ষাপটে নারীদের মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রথমেই জোর দিতে হবে সারা দেশে মানসম্মত শিক্ষার বিস্তারে।নারীর প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ মূল্যবোধের অবক্ষয়। এক সময় মনে করা হতো, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটলে নারীর প্রতি সহিংসতা কমবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় এ বিষয়টি স্পষ্ট হচ্ছে যে, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ব্যাপক বিস্তারের পাশাপাশি উন্নত নৈতিক মূল্যবোধের ব্যাপক প্রসার ছাড়া নারীর প্রতি সহিংসতা কমবে না। এ বিষয়ে অভিভাবকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।৪.সাধারণতভাবে মনে করা হয়, উন্নত দেশগুলোতে শত শত বছর আগেও নারীরা মর্যাদা নিয়ে চলার সুযোগ পেতেন। কিন্তু বাস্তবে বিষয়টি যে এমন নয় তা ব্রিটেনের একটি উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট হয়। আমরা জানি, শিল্পসমৃদ্ধ ব্রিটেনে ১৮৮২ সাল পর্যন্ত নারীর সম্পত্তির মালিকানা ছিল তার স্বামীর দখলে। আজ অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হলেও ওই সময় ব্রিটেনের নারীর অর্জিত অর্থের মালিকও ছিলেন স্বামী। এই উদাহরণ থেকেই স্পষ্ট হয় ওই সময় অন্যান্য দেশে নারীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ে কী সংগ্রাম করতে হয়েছে। এ চিত্রের সঙ্গে হাজার বছর আগের চিত্র তুলনা করলে নারীদের সংগ্রামের চিত্রটি আরও স্পষ্ট হবে। কিন্তু হাজার বছর আগের ওই নারীদের অধিকার আদায়ের তথ্য হয়তো আমাদের জানা হবে না কখনও।হাজার বছর আগে যেসব নারী বিস্ময়কর সাফল্যের পরিচয় দিয়েছেন, সেসব তথ্য পাওয়া গেলেও তারা কতটা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন তার সঠিক তথ্য সহজলভ্য নয়। ওই সময় সাফল্যের জন্য তাদের কতটা পরিশ্রম করতে হয়েছে তা সহজেই অনুমান করা যায়। হাজার বছর আগে নারীরা কতটা বঞ্চনার শিকার হয়েছেন, সেসব তথ্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করা হলে অতীতে নারীদের সংগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও বেরিয়ে আসবে, যা মানব সভ্যতার ইতিহাসে মূল্যবান দলিল হিসেবে সমাদৃত হবে।অনেকেই সফল নারীর উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিজ্ঞানী পোল্যান্ডের নাগরিক মেরি কুরির সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন। কিন্তু সাধারণ পরিবারের তরুণী মেরি কুরিকে তার লক্ষ্যে পৌঁছাতে কী সংগ্রাম করতে হয়েছে তা ক’জন জানেন? ব্যক্তি মেরি কুরির জীবনেও আছে অনেক কষ্টের ইতিহাস, যা যে কোনো নারীর মনোবল দৃঢ় করার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সহায়ক হবে।৫.নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন পর্যায়ে বহুমুখী কর্মকাণ্ড অব্যাহত থাকলেও বিদ্যমান প্রকল্পগুলো থেকে দরিদ্র পরিবারের নারীরা কতটা উপকৃত হন তা খতিয়ে দেখা দরকার। যেসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে নারীর অর্থনৈতিক সক্ষমতা দ্রুত বাড়বে, সেসব প্রকল্প বাস্তবায়নে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সারা দেশে গৃহস্থালি কাজের সঙ্গে যুক্ত বিপুলসংখ্যক নারী-পুরুষ কোনো মজুরিই পান না। কিন্তু গ্রামীণ জনপদে বসবাসকারী পুরুষরা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত থাকলেও নারীদের সে সুযোগ তুলনামূলক কম। উল্লিখিত নারীদের অনেকেই অর্থের অভাবে এমনকি জরুরি চিকিৎসাসেবা থেকেও বঞ্চিত হন। এসব নারীর জীবনমান উন্নয়নে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। নারী নির্যাতন রোধে করণীয় নিয়ে অনেক আলোচনার প্রেক্ষাপটে এ বিষয়ে কী অর্জিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা দরকার। প্রান্তিক পর্যায়ের নারীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানো হলে এবং তাদের মূলধারার অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে যুক্ত করা হলে তা নারী নির্যাতন হ্রাসে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে, এমনটাই আশা করা যায়। নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা না হলে, পরিবারে ও সমাজে নারীকে তার প্রাপ্য মর্যাদা না দিলে সার্বিকভাবে সামাজিক প্রগতি বাধাগ্রস্ত হবে। নারীর ক্ষমতায়নে আমাদের অনেক দূর যেতে হবে এটাসত্য; কিন্তু প্রাথমিকভাবে উল্লিখিত বিষয়গুলোর প্রতি অত্যধিক গুরুত্ব না দিলে দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি : প্রকাশক, দৈনিক যুগান্তর 

© 2017 Golden Femina. Developed by Optimo Solution