Contact: 8951233, +880 1911 485949
Golden Bangladesh, House#6, Road-1, Sector-4, Uttara, Dhaka-1230

সত্য-সুন্দরের প্রশ্নে দীপ্ত হই

সত্য-সুন্দরের প্রশ্নে দীপ্ত হই

 কী হবে লিখে? কেউ কি পড়ে? পড়লেও বোঝে কি? বুঝলেও মানে কি? ২০০২ সালে সিমি লজ্জা দিয়েছিল। সমাজের বিবেককে দায়বদ্ধ করে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছিল। সিমি লিখে গিয়েছিল, সমাজের কিছু সুবিধাবাদী মুখোশধারী মানুষের মুখোশ খুলতে এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাতে তার এই আত্মহনন।

প্রতিবাদের সবগুল ভাষা যখন শব্দহীন অকার্যকর_ তখন এটাই ছিল সিমির কাছে এক এবং একমাত্র পথ। কী নিদারুণ অসহায়ত্ব! সিমি কোনো দলে ছিল না। সিমি ছিল সাধারণ একটি মেয়ে, সাধারণ একজন মানুষ। নিভৃতচারী বিপ্লবী। কুসংস্কারাচ্ছন্ন প্রথার বিরুদ্ধে একনিষ্ঠ কর্মী। কেবল বিবেক আর বোধের স্পষ্টতা আর সত্য-সুন্দরের কাছেই ছিল তার দায়বদ্ধতা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে তার লিখিত আর্তচিৎকার- ভেবেছিল কেউ না কেউ পড়বে, জানবে এবং জানাবে। সত্য প্রতিষ্ঠায় বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ করেছিল সমাজকে। ২০০২ থেকে ২০১২ পেরিয়ে আজ ২০১৩। কেমন আছে লজ্জা পাওয়া দায়বদ্ধ সেই বিবেক? কেমন আছে সৎ, সাহসী, প্রগতিশীল সত্যগুলো?
 কিছুই কি বলার নেই?
 বেঁচে থাকাটাই যেন আজ পরিহাস! আর তাই খুব সহজেই মৃত্যুকে নিয়ে খেলছে মানুষ। কত সহজেই মানুষ মানুষকে খুন করে, ধর্ষণ করে, এসিড ছোড়ে। ধর্ষণের খেলায় মেতে উঠেছে যেন সমাজ। আমরা প্রতিবাদ করছি, চিৎকার করছি কিন্তু বন্ধ হচ্ছে না নারীর ওপর সহিংস আচরণ। প্রতিবাদ, চিৎকার কী সমস্বরে হচ্ছে? সঠিকভাবে হচ্ছে? সবাই কি মুখ খুলছি? সুবিধাভোগীরা ভাবছি এমন তো হয়ই। কত আর প্রতিবাদ করা যায়? নিজেরাই বা কতটা ভালো আছি! মুখ খুলে কি লাভ? মুখ খুললেই বা কি খুব লাভ হয়! তাহলে সবকিছুই চলে যাবে নষ্টদের দখলে? কিছুই কি করার নেই? কিছুই কি বলার নেই?
 এ লজ্জা আমাদের
 নিম্নআয়ের নারী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা যারা ভাবতে পারি; অন্তত ভাবতে পারার মতো সুবিধাজনক স্থানে আছি, তারা কি যথেষ্ট নিরাপদ? আমাদের কর্মস্থল,কর্মপরিবেশ কতটুকু নারীবান্ধব? কিংবা কতটুকু সাহস কিংবা শক্তি রাখি_ এ নিয়ে কথা বলার? আমরা শুধু নিম্নবিত্ত শ্রেণীর মেয়েদের নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে কথা বলি কিংবা বলতে ভালোবাসি। এর কারণ কি তাদের অসহায়ত্ব? নাকি তারা বলছে, আমরা বলছি না। আমরা বলতে পারছি না। তারা সাহস করে পথে নামছে, আমরা নামছি না। আমরা আজও আঁকড়ে আছি তথাকথিত মধ্যবিত্ত মূল্যবোধ আর পারিবারিক সম্মান। যদিও বা কেউ কেউ মুখ খুলছি, কিন্তু রেখে ঢেকে। পাছে লোকে কিছু বলে। শিক্ষিত স্বাবলম্বী একজন নারী যথাযোগ্য স্থানে যেতে পারছে না। গেলেও বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পিছিয়ে পড়ছে। টানাপড়েনের মাঝে ঝরেও পড়ছে কেউ কেউ। কিন্তু কেন? শুধুই কি পারিবারিক অসহযোগিতা? কুসংস্কারাচ্ছন্ন সমাজ ব্যবস্থা? আমাদের কী কোনো দোষ নেই? আমরা কেন কিছু বলছি না? কেন প্রতিবাদ করছি না? কেন চিৎকার করে নিরাপত্তার নিশ্চয়তা চাইছি না? কিসের ভয়? কেন এই দ্বিধা? বখাটেরা কি শুধু পথেই থাকে? অফিস-আদালতেও আছে শিক্ষিত, পদস্থ বখাটে। এসব বখাটে ভদ্রবেশী, মুখোশধারী। যোগ্যতা, চেষ্টা, মেধা সবকিছু থাকা সত্ত্বেও কর্মস্থলে হীনম্মন্য পুরুষের প্রতিহিংসার বলি হচ্ছে হাজারও নারী। বলিষ্ঠতা আর আত্মসম্মান বোধের কাছে ঝরে পড়ছে অসংখ্য নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। বিষয়গুলো আড়ালেই থেকে যাচ্ছে! ৩০ নভেম্বর ২০১২ কর্তব্যরত অবস্থায় খুন হন একজন নারী চিকিৎসক। এর আগে একজন পুরুষ সহকর্মীর বোমার আঘাতে আহত হন একজন নারী। এতো গেল সহিংসতার চূড়ান্ত রূপ। এর চাইতে নিচে আর নামা যায় না। এ রকমই কত নিঃশব্দ সহিংসতা মেনে নিয়ে কর্মস্থলে কর্মরত নারী প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছে। আমরা কি জানি কত নারী কর্মকর্তা প্রতিনিয়ত ষড়যন্ত্রের শিকার হচ্ছেন? সিদ্ধান্ত নেওয়ার পদে আসীন ক'জন নারী সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার রাখেন? প্রশ্ন করা মেয়েগুলো কর্মস্থলে কেমন আছে? শুধু গার্মেন্ট নয়, প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে কেমন আছে নারী শ্রমিক, কর্মচারী, কর্মকর্তারা জানতে হবে, জানাতে হবে। নিজেদের সমালোচনা করতে হবে বলে কথা বলব না কিংবা প্রতিবাদ করব না, তা তো হওয়ার নয়। আমরাও নিরাপদ নই, এ কথা বললে সম্মান যাওয়ার কিছু নেই। সম্মান একান্ত নিজস্ব। আচরণ এবং শিক্ষার মতো। যা কেউ চাইলেও কেড়ে নিতে পারবে না। শিক্ষিত, সুবিধাভোগী শ্রেণীভুক্ত হওয়ার পরও আমরা মুখ বুজে সয়ে যাই। এ বড় লজ্জার। সত্যের নারী পুরুষ
 সৎ এবং সত্যের কি কোনো নারী পুরুষ হয়? কিংবা মনুষ্যত্বের? অন্যায় কিংবা অন্যায়কারীর কি কোনো লিঙ্গ ভেদাভেদ আছে? থাকা উচিত কি? নিশ্চয়ই নয়। খুব বেশি বোধহীন স্থবির মানুষগুলোকে সত্যের মুখোমুখি হতে হবে। পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা_ ছিল, আছে, হয়তো থাকবে কিংবা নয়। কিন্তু নারী কি তাই বলে দায়িত্ব কিংবা জবাবদিহিতা থেকে পিছিয়ে যাবে? জবাবদিহিতায় স্বচ্ছতা বাড়ে, বাড়ে স্পষ্টতা। নারী তো মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। তবে সে কেন থাকবে জবাবদিহিতার বাইরে? সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর্যায়ে একজন নারীও যদি থেকে থাকে তবে তাকেও জবাব দিতে হবে। জবাবদিহিতার প্রশ্নে সে মুখ খুলবে। কারণ দর্শাতে গিয়ে জানাবে তার সমস্যা। বেরিয়ে আসবে লুকানো ফাঁকফোকর। এই প্রক্রিয়ায় সমাধান হবে অনেক বেশি গতিশীল। পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব সম্পন্ন অন্যায়কারী যে কেউ এই জবাবদিহিতার অংশ হতে বাধ্য। তা না হলে গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনে গৃহপরিচারিকার মৃত্যু বন্ধ হবে না। বন্ধ হবে না উচ্চবিত্ত শ্রেণীর অলিখিত যৌতুক সংস্কৃতি। সংসদ কিংবা সরকারি অথবা বেসরকারি যে কোনো সংস্থায় আজ নারী প্রতিনিধিদের অবস্থান তাই জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে সংখ্যাগত বৃদ্ধিই ঘটবে। গুণগত কিংবা সার্বিক মান উন্নয়নে থাকবে না তাদের কোনো অবদান। এই কাজটির জন্য প্রয়োজন হবে আত্মসমালোচনার। দাঁড়াতে হবে সত্যের মুখোমুখি। শিক্ষিত, সুবিধাভোগী নারীসমাজকে জবাবদিহিতার এই দায়ভার নিতে হবে দ্বিধাহীন কণ্ঠে, বাধাহীন প্রত্যয়ে। সত্য এবং সুন্দরের প্রশ্নে অনমনীয় দৃপ্ত পদক্ষেপে তারাই এগিয়ে আসবে। 'আমরা যদি না জাগি মা? কেমনে সকাল হবে?' _নতুন প্রত্যয়ে শুরু হোক নতুন পথ চলা।

 লেখক : সাকিলা মতিন মৃদুলা
তথ্যসূত্র : নিউজ বাংলা.কম

© 2017 Golden Femina. Developed by Optimo Solution